The National Youth Day 2022 | জাতীয় যুব দিবস- যুবকদের প্রতি

National Youth Day

জাতীয় যুব দিবস জানুয়ারি মাসের 12 তারিখ সারাদেশব্যাপী উদযাপিত হয়(The National Youth Day is celebrated entire the whole Country on 12th January)। এই বছর অর্থাৎ 2022 সালে সারাদেশ ব্যাপী এ দিবসটি পালন করা হবে 12ই জানুয়ারি, বুধবার।

সারা পৃথিবীব্যাপী আন্তর্জাতিক স্তরে এবং দেশ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় উৎসব বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিরূপণ করা হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্য এবং আদর্শকে স্মরণ করার নিমিত্তে বিভিন্ন ধরনের জাতীয় দিবস পালন করা হয়। জাতীয় যুব দিবসও এই ধরনের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিবস।

কেন জাতীয় যুব দিবস পালন করা হয় | Why the National Youth Day is Celebrated-

যুবকরাই হল আমাদের দেশের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই সম্পদ কেবলমাত্র বর্তমানের জন্যই নয়, অতীতেও বিভিন্ন ধরনের মহাপুরুষ আমাদের দেশের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিশেষভাবে ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন বলেই ভারতবর্ষের স্থান সারা পৃথিবীর মধ্যে এক বিশেষ জায়গায় অবস্থান করছে। এবং অদূর ভবিষ্যতেও বর্তমান যুবকদের অনুপ্রেরণামূলক অংশগ্রহণ ভারতবর্ষকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে।

ঠিক এই কারণেই যুবকদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের নিমিত্তে তাদের কার্যকরী ভূমিকাকে উৎসাহ প্রদানের জন্য যুবকদের আদর্শ, স্বচ্ছতা, সত্যবাদিতা এবং কর্মে উজ্জীবিত করার জন্য যুব দিবসের সূচনা।

কেন 12 ই জানুয়ারি যুব দিবস | Why the National Youth Day is on 12the January?

আমরা জানি 12 ই জানুয়ারি দিনটি ভারতবাসী পক্ষে গর্বের দিন। এই দিনে ভারতের চিরসবুজ, চির যুবক, কর্মে উজ্জীবিত, চিরকুমার স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন। তার প্রকৃত নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ডাক নাম নরেন। নরেন থেকে স্বামী বিবেকানন্দ এর বিরাট চড়াই-উৎরাই পথ। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনকে সামনে রেখে যুব দিবসের দিন ধার্য করা হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ একজন বিখ্যাত আদর্শবান প্রাণপুরুষ, যিনি জাতির যুবকদের কাছে এক অনুপ্রেরণা মূলক ব্যক্তিত্ব।

স্বামী বিবেকানন্দের সারা জীবন ব্যাপী কার্যপ্রণালী, তার সেবামূলক কর্মযোগ, বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন কেবলমাত্র সাধারণভাবে গল্পের ছলে বর্ণনা করার মত লোক বিষয় নয়। এই মহান পুরুষের কর্মময় জীবন যদিও খুব সীমিত সময়ের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, কিন্তু সেই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করা হয়তো সম্ভব হবে না। আমরা যদি তার অতি ক্ষুদ্র কোন একটি অংশকে ধারণ করে জীবন যাপন করতে পারি, তাহলে কেবলমাত্র নিজের শান্তি বজায় থাকবে না, সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রসারিত হতে বাধ্য হবে। কেননা কেবলমাত্র তিনি আমাদের জাতীয় আদর্শবান পুরুষই ছিলেন না, তার আদর্শ এবং সেবাকর্মের সুগন্ধ আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত প্রসারিত। তাই তিনি একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বও বটে।

1984 সাল। দেশের প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সেই বছর 12ই জানুয়ারীকে জাতীয় যুব দিবস হিসাবে পালন করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ঠিক তার প্রের বছর 1985 সাল থেকে আজ পর্যন্ত জাতীয় যুব দিবস পালিত হয়ে আসছে।

বিবেকানন্দের জন্ম । Birth Of Swami Vivekananda-

আমরা সকলেই জানি 1863 সালের 12 জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর পৈত্রিক বাসভবনটি রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউটের সদরদপ্তর। বিবেকানন্দের পিতা ছিলেন বিশ্বনাথ দত্ত এবং তার পিতামহের নাম দুর্গাচরণ দত্ত, যিনি মাত্র 25 বছর বয়সেই সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। স্বভাবতই বিবেকানন্দের কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ আশ্চর্যের ছিলনা। বিবেকানন্দের মায়ের নাম ভুবনেশ্বরী দেবী।

বিবেকানন্দের পিতা পিতামহ এবং তার মায়ের আদর্শ সারা জীবনের সঙ্গী। পারিবারিক জীবনযাপন ও পরিবেশ থেকে মানবতার বৈশিষ্ট্য গুলি তারমধ্যে জাগরিত হয়- জীব প্রেমময়ী এক মহান অনুভব।

তার পিতা এবং পিতামহ দুজনেই ছিলেন সুশিক্ষিত এবং অ্যাডভোকেট। তারা কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন নি, প্রকৃত শিক্ষা বলতে যা বোঝায়- মানবিকতা, সহানুভূতি এবং অন্যদের প্রতি প্রেম, শ্রদ্ধা, সমস্ত আদর্শ যেমন তাদের শিরা-উপশিরায় অধিষ্ঠিত ছিল, সেই বৈশিষ্ট্যগুলি স্বামী বিবেকানন্দ বংশানুক্রমিক ভাবে পেয়েছিলেন।

বিশ্বনাথ দত্ত বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং বিভিন্ন পুস্তকের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। বেদ-বেদান্ত থেকে শুরু করে বাইবেল, এমনকি সুফি কবিতাও ছিল তার আকর্ষনীয় বিষয়। বিশ্বনাথ দত্তের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠ বই ছিল দিওয়ানে হাফিজ। দিওয়ানে হাফিজ পারসি সুফি কবিতার বই। কবিতাগুলি তিনি তার পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠ করতেন। এখান থেকেই স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি উদারতা এবং প্রেম।

তার মা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন একজন আধ্যাত্বিক মহীয়সী মহিলা। স্বামী বিবেকানন্দকে তার ছেলেবেলায় সত্যের সঙ্গে চলার পরামর্শ দিতেন। সত্যের সঙ্গে চলতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। বিভিন্ন মানুষ ভুল বুঝতে পারে এবং সত্যবাদী মানুষকে অপমান, গালিগালাজও করতে পারে। কিন্তু কখনোই সত্যের সঙ্গ ছাড়া উচিত নয়। কেননা সত্য কখনো, সত্যের সঙ্গে থাকা মানুষদের ক্ষতি করে না। সত্যের আদর্শ নিয়ে চলার জন্য কোন মানুষকে ছোট বা নিচ দেখানো এক ভয়ঙ্কর অপরাধ, যা মানুষকে তার আদর্শ থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে- তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া এই মহৎ বাক্যগুলি স্বামী বিবেকানন্দকে কখনোই নিরাশ করেনি।

বিবেকানন্দের ছেলেবেলা | Childhood of Swami Vivekananda

1871 খ্রিস্টাব্দে আট বছর বয়সে তাকে ভর্তি করা হয় মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে, যেখানকার প্রধান ছিলেন এক বিখ্যাত মহাপুরুষ- ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের সান্নিধ্য বিবেকানন্দকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে। মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট বর্তমানে যেটা বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত।

তিনি 1879 সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন ডিগ্রি লাভ করার জন্য। প্রেসিডেন্সি কলেজ ডেভিড হেয়ার এবং রাজা রামমোহন রায়ের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছিল। যে প্রেসিডেন্সি কলেজের একনিষ্ঠ তরুণ শিক্ষক ছিলেন হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও। এই সমস্ত মহান ব্যক্তিত্বপূর্ণ মহাপুরুষ তাই বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত। তাদের আদর্শ প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রতিটি ইট-পাথরে গাঁথা আছে। সেই প্রতিষ্ঠান নরেনকে বিবেকানন্দ হওয়ার পথ প্রশস্ত করে। এখান থেকেই তিনি পান ডিরোজিওর আদর্শ।

ডিরোজিও, তিনি তার চেয়ে বয়সে বড় ছাত্রদের সব সময় সত্য ও বিজ্ঞানের সঙ্গে চলার পরামর্শ দিতেন। তিনি তৈরি করেছিলেন ইয়ং বেঙ্গল বা নব্য বাংলা নামে একটি দল, যাদের আদর্শ ছিল বৈজ্ঞানিক যুক্তি নির্ভর কার্যপ্রণালী গ্রহণ করা ও প্রাধান্য দেওয়া, অযৌক্তিক, কুসংস্কারের বিরুদ্ধাচরণ। তাছাড়া মুক্ত চিন্তা ধারার স্রোত ডিরোজিওর ছাত্রদের মধ্যে প্রবাহিত করেন। পরবর্তীকালে বিবেকানন্দ সেই আদর্শকে অন্তরে স্থান দিয়েছেন।

বিবেকানন্দের মধ্যে রাজা রামমোহনের আদর্শ-

আমরা জানি রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর আদর্শ ছিল বিশ্ব ভাতৃত্ব বোধ, কুসংস্কার বিরোধিতা, একেশ্বরবাদ, মূর্তি পূজা না করা, বর্ণ বৈষম্য বিরুদ্ধাচরণ ইত্যাদি ইত্যাদি। রামমোহন রায় আবার আদি শঙ্করাচার্যের আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আদি শংকরাচার্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন উপনিষদে। আদি শঙ্করাচার্যের লেখা অদ্বৈত বেদান্ত রামমোহন রায়ের বিশেষ আকর্ষণের বিষয় ছিল। শঙ্করাচার্য ব্রহ্মবাদে বিশ্বাসী। আত্মা এবং পরমাত্মা মূলত একই বিষয়। তার কথা অনুযায়ী- আমি যদি ব্রহ্ম হই,  তাহলে তুমিও ব্রহ্ম। তাহলে কেন মানুষের মানুষের এত ভেদাভেদ? নিজের মধ্যে অন্যকে দেখা এবং অন্যের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করাই হল প্রকৃত ধর্ম।

বিবেকানন্দ রাজা রামমোহন রায়ের এই ধরনের আধ্যাত্মিকতাকে বিশেষভাবে মনেপ্রাণে স্থান নিয়েছিলেন। রাজা রামমোহন রায়, শঙ্করাচার্য, উপনিষদ অদ্বৈত বেদান্তের মধ্যে যে আদর্শ এবং মূল্যবোধ নিহিত ছিল, সেটাকেই বিবেকানন্দ সুদুরপ্রসারি করেছিলেন। যার ফলাফল তিনি নিউ ইয়র্কে বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে বেদান্ত সোসাইটি বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়েছে।

বিবেকানন্দের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদর্শ এবং মূল্যবোধ। রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মসমাজ পরবর্তীকালে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয় এবং এই শাখা গুলির মধ্যে এক বিশেষ শাখা গঠনে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কেশবচন্দ্র সেনের এক বিশেষ ভূমিকা ছিল। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজ ছিল ওয়েস্টার্ন Esotericism-এর বিশেষ ভূমিকা।

Esotericism  ছিল বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ এবং খ্রিস্টান ধর্মের বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন বর্তমানে Freemasonry, যেটাকে একটি পৃথক ধর্ম বা সংস্কৃতিও বলা যেতে পারে। ফ্রিম্যাসনদের জন্য একটি বিশেষ লোগো ব্যবহার করা হয়। বিবেকানন্দ ফ্রি ম্যাসনরিতেও নিযুক্ত হয়েছিলেন। এবং এই সংস্থার কিছু মূল্যবোধ এবং আদর্শ তার অন্তরে স্থান পেয়েছিল। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তিনি নিজেকে মাস্টার্মেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুনলে আশ্চর্য হতে হয় মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই তিনি এই যোগ্যতা অর্জন করেন।

আরো পড়ুন

মহিলাদের প্রতি প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি
সমাজে টি ভি সিরিয়ালের প্রভাব
বয়স্ক মা-বাবাকে অবহেলা- ভয়ানক অপরাধ
একান্নবর্তী পরিবার ও অনু পরিবার এবং সমাজ
ভারতীয় সমাজে নারীর অবস্থান
আঁতুড়ঘরে 1 মাস
বিধবা বিবাহ
ভারতের বিস্ময় কন্যা জাহ্নবী পানোয়ার

মাত্র কুড়ি বছর বয়সে বিবেকানন্দের মাস্টারম্যাশনের সাফল্য, বর্তমান কুড়ি বছর বয়সে যুবক-যুবতীদের মধ্যে তুলনা করলে কি অর্থ দাঁড়ায়? বর্তমান সময়ে এই বয়সে তরুণ তরুণীরা কি কি বিষয়ে যোগ্যতা অর্জন করল? কিছুই না, তারা কেবল সময় নষ্ট করছে পাবজি অথবা ফ্রী ফায়ার খেলে। অথবা কিছু অশ্লীল ছবি ভিডিও দেখে অথবা সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজেকে প্রদর্শন করে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি বিবেকানন্দ যেসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কে জড়িত। যেমন- বিদ্যাসাগরের চিন্তাভাবনা, রাজা রামমোহন রায়, ডিরোজিও, ডেভিড হেয়ার ইত্যাদি মুক্ত চিন্তা ভাবনা, বৈজ্ঞানিক যুক্তি, কুসংস্কারে অবিশ্বাস করা। অন্যদিকে আধ্যাত্বিক চেতনার মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করা। আর একটাদিকে রবীন্দ্রনাথ, কেশব চন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভিন্ন আদর্শ তার চরিত্র অলঙ্কৃত করে।

বিবেকানন্দ একটি বিশেষ আদর্শ ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী করতেন, যা অতীন্দ্রিয়বাদ(Transcendentalism) নামে পরিচিত। সকল ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মমানের সাথে, এমন এক ধরনের দর্শন, যা প্রকৃতির বিরুদ্ধে অন্যায় আচরণ গুলোকে প্রশ্রয় দেয় না। বরং প্রকৃতির বিরুদ্ধে অন্যায় আচরণ গুলোকে প্রতিবাদ করে। এই আন্দোলন প্রকৃতিকে ভালবাসতে শেখায়, সম্মান দেখাতে শেখায়, যা পার্সোনাল আধ্যাত্বিক জীবনযাপনের সঙ্গে নিজের প্রয়োজনে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রকৃতিকে এক বিশেষ সম্মানীয ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। প্রকৃতির উপর ভালোবাসার আচরণ করা উচিত বলে তিনি মনে করতেন।

Affiliate Disclaimer-
Bongobodh is a participant in the Amazon Services LLC Associates Program, an affiliate advertising program designed to provide a means for sites to earn commissions or advertising fees by advertising and linking to Amazon.in.

তাই আমরা বলতে পারি বিবেকানন্দকে একটি ক্যানভাসের উপর সূচিত্রিত ছবির মত দেখা উচিত। যার মধ্যে রয়েছে হিন্দু সনাতনী ধর্মের আদর্শ, বাইবেল এবং পার্সি হাফিজ কবিতা, বেদান্ত, রাজা রামমোহন রায়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেনের আদর্শ, ফ্রী ম্যাসনরি, transcendentalism এর একটি প্রতিকৃতি।

এরই সূত্র ধরে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি পাশ্চাত্য দর্শনকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে জীবনাদর্শে স্থান দেন। পাশ্চাত্য দার্শনিকদের মধ্যে তার প্রিয় ছিল ইমানুয়েল কান্ট, জন স্টুয়ার্ট মিল, চার্লস ডারউইন প্রমুখরা। তবে হার্বাট স্পেন্সারের দর্শনের উপর সবচেয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন‌। তাইতো তিনি তার ‘এডুকেশন’ নামে একটি বই বাংলায় অনুবাদ করে ফেলেন।

দার্শনিক থেকে সন্ন্যাসী পথে-

কলেজে ক্লাস চলছিল। উইলিয়াম হাসটি ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা পড়াচ্ছিলেন। কবিতার নাম দ্য এক্সকার্শন। ওই কবিতার মধ্যে ট্রান্স(Trance) নামক একটি শব্দ ছিল। উইলিয়াম হাসতি শব্দটির অর্থ বোঝাচ্ছিলেন ছাত্রদের। বিবেকানন্দ এবং তার বন্ধুরা কিছুতেই শব্দটির অর্থ বুঝতে পারছিলেন না। বারবার তিনি জিজ্ঞাসা করছিলেন শব্দের প্রকৃত অর্থ। এর উত্তরে তিনি বিবেকানন্দকে বলেছিলেন-যাও রামকৃষ্ণকে দেখো, এই শব্দটির অর্থ বুঝতে পারবে।

রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে যোগাযোগ-

রামকৃষ্ণদেব ধর্মীয় আলোচনা সভায় এসেছিলেন কলকাতায়। বিবেকানন্দ এবং তার কয়েকজন বন্ধুরা মিলে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। সেই অনুষ্ঠানে যার গান গাইবার কথা ছিল তিনি আসেননি। পরিবর্তে বিবেকানন্দ ওই সভায় গান গেয়েছিলেন। বলতে ভুলে গেছি নরেন একদিকে যেমন মেধাবী ছাত্র ছিলেন, অন্যদিকে ভালো গায়ক ছিলেন। তিনি ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিকও শিখেছিলেন। রামকৃষ্ণদেব তার গান শুনে তাকে দক্ষিণেশ্বর আসতে বলেন।

এভাবেই বিবেকানন্দের সঙ্গে রামকৃষ্ণের যোগাযোগ এবং দক্ষিণেশ্বরে আসা-যাওয়া। বিবেকানন্দ বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞাসা করতেন- ভগবানকে দেখেছেন কি’না। প্রত্যেকেই তার কথার উত্তর এড়িয়ে যেত অথবা উল্টোপাল্টা কিছু উত্তর দিত। ঠিক একই প্রশ্ন তিনি রামকৃষ্ণদেবকেও করেছিলেন। উত্তরে রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন- ‘হ্যাঁ দেখেছি। যেমন আমি তোকে দেখছি, সেইরকমই। এরচেয়ে আরো পরিষ্কার।’ বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণদেবের পরীক্ষা নিতে চাইলেন। তিনি রাজি হলেন। এরই ফলস্বরূপ রামকৃষ্ণদেবকে নিজের গুরু বলে স্বীকার করেছিলেন, যা সারা জীবন ব্যাপী তিনি তার গুরুদেবের আদর্শ শিষ্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

দারিদ্রতা ও বিবেকানন্দ-

1884 সালে বিবেকানন্দের B.A পরীক্ষা শেষ হতে চলেছে। ঠিক সেই সময় তার পিতা বিশ্বনাথ দত্ত মারা গেলেন। বিশ্বনাথ দত্ত বিশাল ঋণের বোঝা তার পুত্রদের মধ্যে চাপিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে থেকে ঘরবাড়ি, জমি, সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আদালতে মামলা রুজু হলো। ঠিক এই সময় থেকেই নরেন প্রথমবারের জন্য অভাব কি বিষয় সেটাই অনুধাবন করতে শেখেন‌। কাজের খোঁজে এখানে সেখানে, বিভিন্ন কোম্পানি দপ্তরে ঘুরতে থাকেন। কোথাও তার কাজের সন্ধান হলো না। গরিবি, দারিদ্রতার প্রতি এক নিবিড় বন্ধন যুক্ত হলো তার জীবনে। যদিও গরিবদের প্রতি দুঃখ ও সহানুভূতি ছিল, কিন্তু গরিব-দুঃখীদের মানসিক অনুভূতি কাছে প্রথমবার তিনি পৌছলেন। গরিব-দুঃখীদের প্রতি সহানুভূতি, প্রেম আরো ঘনীভূত হলো। উনি বুঝতে পারলেন সমাজে গরিবদের, অর্থহীনদের কোন দাম নেই, কোনো মর্যাদা নেই। 

গুরুদেবের কাছে তাই ঘনঘন যাওয়া। সমাধি, ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করলেন এবং গুরুদেবের কাছে নির্বিকল্প সমাধি শিখতে চাইলেন। নির্বিকল্প সমাধি সমাধির উচ্চতর পর্যায়। গুরুদেব বললেন- নির্বিকল্প সমাধি হল মানুষের ছোট মনের ইচ্ছা, যে ইচ্ছা কেবলমাত্র ব্যক্তিজীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। আশাপাশের বহির্জগতের সার্বিক জীবনের প্রতি কোনো মূল্য দেয় না। মানুষের সঙ্গে থাকা, মানবিকতা মানুষের সেবা করাই হচ্ছে ঈশ্বরের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভক্তি।

 বিবেকানন্দের চৈতন্য হলো। 1888 সাল মাত্র 25 বছর বয়সে বেরিয়ে পড়লেন ভারত যাত্রায়। সঙ্গে শুধু লাঠি, ভিক্ষার ঝুলি, কমণ্ডলু আর দুটি বই। বই দুটি হলো- ভগবত গীতা এবং ইমিটেশন অব ক্রাইস্ট।

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, গুজরাট থেকে অরুণাচল। দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে, গরিব-দুঃখী, ধনী, রাজা, ভিখারি প্রত্যেকের সঙ্গে তার বন্ধন তৈরি হলো। বিভিন্ন ধরনের মানুষ, জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন। বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ভারতবর্ষের মাটিকে স্পর্শ করা ও তার গভীরে প্রবেশ করা। ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করা। একেবারে মানুষের কাছে থেকেই সারা ভারতবর্ষকে চেনার অভিজ্ঞতা, জানার আকুতি বিবেকানন্দকে পৌঁছে দিল একেবারে ভারতবর্ষের মধ্যে, হৃদয় পদ্মে।

শিকাগো ধর্ম সম্মেলন | Conference in Chicago-

1893 সাল বিশ্বধর্ম মহাসভা চলছে আমেরিকার শিকাগো শহরে। আজীবনের অভিজ্ঞতা, বেদ বেদান্ত দর্শন এবং নিজের অনুভূতির কথা বিশ্ববাসীর কাছে তাদের সামনে তুলে ধরলেন তুলে ধরেন। ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন, মানুষের হাহাকার, মানুষের যথার্থ চাহিদার আকুতিকে, প্রেম, ভালোবাসা, সহানুভূতি, মান মর্যাদা। মুগ্ধ হল সারা বিশ্ব। আন্তর্জাতিক এই মহাসভায় উজ্জ্বল হয়ে থাকল ভারতবর্ষের মানুষের জয় গান।

বর্তমান ধ্বজাধারী ধর্ম, ধর্ম নিয়ে গলা ফাটানো ধর্ম প্রচারকদের থেকে বিবেকানন্দের স্থান কত উঁচুতে সেটা বলার মত জ্ঞান অর্জন করা মানুষের সংখ্যা খুবই কম। ক’টা মানুষ জোর গলায় বলতে পারে- গীতা পড়ার চেয়ে ফুটবল খেলা অনেক উৎকৃষ্ট। তাতে স্বর্গ যাবার সুযোগ আরো বৃদ্ধি পায়।

বিবেকানন্দের কর্মজীবন মাত্র 39 বছরেই(1963-1902) পরিসমাপ্তি হয়েছিল। এই স্বল্প বয়সের মধ্যেই তাঁর আদর্শ, তার তেজ, তার জ্যোতি আমরা কতটুকু বহন করতে পারছি? তার নিজের হাতে তৈরি রামকৃষ্ণ মিশন, বেলুড় মঠের মর্যাদাই বা আমরা কতটা রাখতে পারছি? প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্ন ওঠে, ওই মর্যাদা রাখার জন্য আমাদের কি কোন প্রশ্ন করা উচিত?- এই বিষয়েও। তাই জাতীয় যুব দিবস কেবল 12 জানুয়ারি নয়, বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জীবনযাত্রায়, চলনে-বলনে, কর্মে এবং দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, জুড়ে যাক, জাতীয় যুব দিবসের(Yuva Diwas) জীবনাদর্শ ও মূল্যবোধের জীবনচরিত। ধন্যবাদ।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.