Female Foeticide in India

About 10 lakh Female Foeticide in India in Every Year- a Worst Criminal Offence | কন্যাভ্রূণ হত্যা

পৃথিবীর যত জঘন্যতম অপরাধ মূলক কাজ আছে তার মধ্যে অন্যতম কন্যা ভ্রুণ হত্যা (Female Foeticide or Female feticide)। সারা পৃথিবীতে অল্পবিস্তর এই জঘন্যতম কাজ সংঘটিত হলেও ভারতে কণ্যা ভ্রূণ হত্যা( Female Foeticide in India) অপরাধের হার অত্যন্ত বেশি। এর বিরুদ্ধে সরকারি আইন আছে, আদালত আছে, অপরাধের শাস্তি আছে। কিন্তু তারই ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার অপরাধী। একদিকে জন্মগ্রহণ করার পূর্বেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে লক্ষ-লক্ষ কন্যা শিশু। আবার জন্মগ্রহণ করার পরও হত্যা করা হচ্ছে কন্যা শিশুকে।

এর পেছনে কারণ এবং তার ফলাফল সারাদেশ জুড়ে সামাজিক প্রভাব ফেছে। নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই আলোচনা প্রসঙ্গে অনেকেই স্বভাবসুলভ বশে বলে থাকেন- তুলনামূলকভাবে নিচু শ্রেণীর সমাজে, অর্থনৈতিকভাবে নিম্নশ্রেণির পরিবারের লোকেরা এই জঘন্য কাজ করে থাকে। কিন্তু দেখা গেছে অপেক্ষাকৃত উচ্চ শিক্ষিত পরিবারগুলোর মধ্যে এই জঘন্যতম কাজ সবচেয়ে বেশি সংঘটিত হয়।

আপনাদের আমির খানের সঞ্চালনায় সত্যমেব জয়তে অনুষ্ঠানের কথা মনে আছে। ওখানে কন্যাভ্রূণ হত্যা(Female Feticide) নিয়ে সিজিন ১ এর ১নং এপিসোড কথা- আমিষা নামের সেই মহিলা, যিনি যারপরনাই অত্যাচারিত হয়েছিলেন। বারবার তার জঠরের ভ্রুনকে হত্যা করত তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি। স্বামী শ্বশুর-শাশুড়ি তিন জনই শিক্ষিত এবং সমাজের প্রতিষ্ঠা ব্যক্তি ছিলেন। সেই মহিলা সত্যমেব জয়তে অনুষ্ঠানে বলছেন তার করুন কাহিনী। তিনি বলছেন- আদিবাসী পরিবারগুলি কন্যাভ্রূণ কখনোই হত্যার মতো জঘন্য কর্মে লিপ্ত হয় না। তারা কন্যাদের যেমন সাদরে জঠরে পালন করেন, তেমনি জন্ম দেন, বড় করে তোলেন।

ভারতে কেন কন্যাভ্রুণ হত্যা হয়? | Why Female Foeticide in India-

ভারতে কেন কন্যাভ্রূণ হত্যা হয়(Why Female Foeticide in India)- এই নিয়ে সকলের অবগতি থাকলেও বর্তমান যুগে নানান কর্মক্ষেত্রের বিস্তার সচেতনতা মানসিকতার উপলব্ধির উৎকর্ষের সাথে সাথে এর সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। কারণ গুলি বাহ্যিক আবরণ পরিবর্তন হলেও ভিতরের কালিমা সেই একই আছে। কন্যাভ্রূণ হত্যার কারণগুলিকে প্রাথমিকভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত করি। যদিও এই কারণগুলি একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সামাজিক সমস্যা ও অর্থনৈতিক সমস্যার আদান-প্রদানে সৃষ্টি হয়েছে এ বিশাল ক্ষতিকারক কর্মকাণ্ড। প্রথমে আমরা সামাজিক কারণ গুলির প্রেক্ষাপট নিয়ে সামান্য আলোকপাত করি।

সামাজিক কারণ(Social Reasons for Female Feticide)-

কন্যার বিবাহ-

আমাদের সমাজে সাধারণ মানসিকতা প্রথমে আসে যে কন্যা বাড়িতে থাকবে না। তার বিবাহ দিতে হবে অর্থাৎ শ্বশুর বাড়িতে যাবে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিয়ের পর কন্যাকে শ্বশুরবাড়ি বা স্বামীর বাড়িতে থাকতে হয়। বিয়ের পর মা-বাবার কাছে থাকলে সমাজ সেটাকে সুনজরে দেখে না। 

নিরাপত্তাহীনতা(Insecurity)-

কন্যা সন্তান অর্থে সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। মা বাবা সব সময় চিন্তা- কন্যা সন্তানকে প্রতি মুহূর্তেই সামাজিক কুনজর থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রহরী হয়ে থাকতে হয়। সর্বদা এই কাজ করার জন্য বছরের-পর-বছর মা-বাবার মানসিক চাপ থেকে কাটিয়ে ওঠার ঝুঁকি নেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই তো কন্যা ভ্রুণকে সমূলেই বিনষ্টের(Female Feticide) পথে হাঁটতে হয়।

বংশ রক্ষা-

বংশ রক্ষা করা মানসিককতা বাংলা কথা ভারতীয় সমাজের এক সাংঘাতিক সমস্যা। পুত্র সন্তান রক্ষায় পারদর্শী। কন্যা সন্তান নয়। নির্বংশ হওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য কন্যাভ্রূণ হত্যার প্রবণতা সংখ্যা বৃদ্ধি অমূলক নয়। আমাদের সমাজের পরতে পরতে বংশরক্ষা, পরলোকের পারোলৌকিক ক্রিয়াকর্ম ইত্যাদির কাজের দায়িত্ব পুরুষের উপরেই বর্তায়। অতএব পুত্রসন্তান সকলের কাম্য।

বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনা-

কন্যা সন্তান শ্বশুরবাড়ি স্বামীর বাড়িতে বসবাস করে। তার মা-বাবার বৃদ্ধবয়সে, অসুস্থতায় তাদের দেখাশোনার জন্য, সেবার জন্য কন্যা সন্তান কোন কাজে আসে না বলে অনেকের ধারণা। তাই পুত্র সন্তানের অভিলাষে কন্যাভ্রূণ হত্যার জঘন্য ক্রিয়া আমাদের দেশে এখনও বহাল তবীয়তে চলছে।

আরো অন্যান্য নানান সামাজিক কারণ থাকলেও মূলত সামাজিক ক্রিয়াকর্মের মহিলাদের অংশগ্রহণে  বাধা, নিরাপত্তাহীনতায বারবার সামনে আসে। একজন পুরুষ কোন মহিলাকে নির্যাতন করলে, অপমান করলে আমাদের সমাজে পুরুষকে যত না অপরাধী হিসেবে গণ্য করে, তার তুলনায় নির্যাতিত মহিলাকে বেশি অপমান করে বা কুনজরে দেখে। মহিলা বা কন্যা সন্তানটি যেন হাজার দোষে দোষী। সেই তার পরিবারের মুখে চুনকালি লাগিয়েছে। বাবা-মা, ভাইয়ের সম্মানহানি করেছে- এই ধরনের সামাজিক সমস্যা এড়ানোর জন্য ভারতে কন্যা ভ্রুণ হত্যা স্বাভাবিক রয়ে পড়েছে(Female foeticide in India is Normal)।

অর্থনৈতিক কারণ-

উপরিউক্ত সামাজিক কারণ গুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থ। সামাজিক কারণ গুলি। বারবার বলে দেয় কন্যা কোন কাজের নয়। বাবা-মার কাছে থাকবে না, বিয়ে হবে, শ্বশুরবাড়ি যাবে‌। যদি রোজগার করে সে টাকায় মা-বাবার প্রতি কোনো সহায়তা নয়, স্বামী শ্বশুর বাড়ির লোকজনদেরই সুরাহার উৎস হিসেবে গণ্য হবে।

মানুষ করার খরচ-

অন্যদিকে বর্তমান যুগে কন্যাকে স্কুল-কলেজ না পাঠিয়ে উপায় নেই। জন্মানোর পর থেকে তার বেড়ে ওঠার জন্য খাবারদাবার, পোষাক, শিক্ষার জন্য স্কুল কলেজে ভর্তি- এসব কাজের জন্য আপনার পরিবারকে অর্থ খরচ করতে হয়, খরচ করতে বাধ্য থাক।  অথচ খরচ করার পর কন্যার কাছ থেকে কোন আউটপুট বা লাভ পাওয়া যায়না। কন্যার পরিবার এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে, হয় কন্যা ভ্রুণ হত্যা(Female feticide) করে নতুবা তাচ্ছিল্য সহকারে কন্যাকে মানুষ করার প্রয়োজনীয় উপকরণ গুলি ন্যূনতম প্রদান করে। দু’টি বিষয় সামাজিক ভাবে ও আইনগত অপরাধ।

কে কাকে দেখবে? 

একজন অন্যায়কারী মানুষ, অন্য একজন একই ধরনের অন্যায় কারী মানুষকে কিভাবে সুপরামর্শ দেবে? আমাদের অস্থিমজ্জায় একই মানসিকতার বিরাজ করলে অপরাধ হ্রাসের সম্ভাবনা কতখানি?

বিবাহ সংক্রান্ত খরচ-

সমাজে এখনো পণপ্রথার মত অনৈতিক কর্ম বহাল তবিয়তে জীবিত। দু-একটি ঘটনা ছাড়া এই প্রথার সমূলে বিনাশ এখনো সম্ভব হয়নি। এ ঘটনা বাবা-মা’র কাছে এক সাংঘাতিক বোঝা।

একদিকে পণপ্রথার বিশাল পরিমাণ নগদ অর্থ তার সাথে আছে গহনা, খাট, আলমারি, কখনো কখনো গাড়ি ইত্যাদি। আবার বিবাহ অনুষ্ঠান নিমিত্তে আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রণ। বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচের ধাক্কা।

এসমস্ত চিন্তাভাবনা আমাদের সমাজে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষ জনের মধ্যে সর্বদা হাডুডু খেলে। কন্যা সন্তান হত্যা, কন্যাভ্রূণ হত্যাও তাই সামাজিকভাবে কোথাও না কোথাও প্রশ্রয় পাচ্ছে।

কন্যা ভ্রুণ হত্যা রোধ করা যাচ্ছে না কেন?

ভ্রূণ হত্যার মতো অপরাধের শাস্তির জন্য আইন আছে। এমনকি ভ্রূণের লিঙ্গনির্ধারণও আইনত সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এমন ঘৃণ্য কাজ রমরমিয়ে চলছে। বর্তমানে আমাদের রাজ্য সরকার কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মত কন্যা সন্তানদের জন্য নানান প্রকল্প চালনা করছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারও বেটি বাঁচাও প্রকল্পের চালাচ্ছে। তা সত্ত্বেও এই জঘন্য ঘটনার রাশ ধরা মুশকিল হয়ে পড়ছে। মানুষের মন থেকে সামাজিক ধারণা গুলি সম্পূর্ণভাবে সরানো কোন মতেই সম্ভব হচ্ছে না।

আইন আছে, ধরা পড়লে শাস্তি পাচ্ছে না তা নয়, কিন্তু আইনের সার্বিকভাবে প্রয়োগও সঠিকভাবে হচ্ছেনা। ‘ঠক বাছতে গাঁ উজাড়’ হয়ে যাবে। পূর্বেই বলেছি সামাজিক ধারণার অবসান না হলে, আইন সার্বিকভাবে কাজ করবে না বা তাৎক্ষণিক সুফল ফলাফল দেবেনা।

বেসরকারি হাসপাতাল ও রেডিওলজি ক্লিনিক গুলিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকে- ‘এখানে ভ্রূনের লিঙ্গ নির্ধারণ হয় না'(Fetal Sex determination is strictly prohibited here)। সিগারেটের প্যাকেটে কোম্পানিগুলির বিধিসম্মত সতর্কীকরণ এর মত- smoking is injurious to health, it may causes Cancer. হাসি পায়। স্টিং অপারেশন করলে বোঝা যাবে সত্যিই কি ঐ সতর্কীকরণ কাজ করে, কি করে না।

সমাজে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাজ সমাপন আমাদের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। সমস্ত আইন বিরুদ্ধ কাজের কথা বলছি না। যেমন- পুলিশকে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই ফাইন না দিয়ে বোকা বানানো। ইটের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও অন্য কারো মাটির বাড়ির সামনে ছবি তুলে সরকারি প্রকল্পের নাম লেখার মত নানান সামাজিক অপরাধমূলক কাজের মত কন্যা ভ্রূনের লিঙ্গ নির্ধারণ করানো ও  করে দেওয়া দুপক্ষই বেশ খুশি।

কন্যা ভ্রূন হত্যার একটি পরিসংখ্যান-

ভারতে গড়ে প্রতি বছর 10 লাখ কন্যাভ্রূণ হত্যা হয় বলে এক সমীক্ষার মত(On an average 10 Lakh Female Foeticide in India has been done brutally every year)। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই এদের সরিয়ে ফেলা হয়। UNICEF রিপোর্ট বলছে- কন্যাভ্রূণ হত্যা গণহত্যা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। হরিয়ানা, পাঞ্জাব, দিল্লি, গুজরাট, হিমাচল প্রদেশ এবং ওড়িশার মোটামুটি একই অবস্থা।

অন্যদিকে প্রতিবছর 200000 কন্যা শিশু মেরে ফেলা হয়। সেন্ট্রাল ফোর্স ফর সোশ্যাল রিসার্চের পরিসংখ্যান বলছে- ভারতের প্রতি 25 কন্যা সন্তানের মধ্যে 1 জনকে হত্যা করা হয়। এবং 15 বছরের নিচে 15 লাখের বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়।

গত কয়েক বছরে কন্যাভ্রূণ হত্যা বেড়েছে 49.2 শতাংশ এবং 50% মেয়ের বিয়ে হয় 18 বছর বা তার নিচে।

আমাদের সমাজে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে মা’কে দায়ী করা হয়। যেহেতু মায়ের জঠরে ভ্রুণ সৃষ্টি হয় বৃদ্ধি পায় ও পরে জন্ম নেয়। তাই মা’ই দায়ী পুত্র কন্যা জন্মানোর জন্য। পুত্র সন্তান জন্ম নিলে মা কে বলা হয় রত্নগর্ভা। আর কন্যা জন্মালে লাঞ্ছনা, অপমান, নির্যাতন। বাধ্য করা হয় এবরশন করানোর জন্য। অর্থাৎ কন্যা ভ্রুণকে হত্যা করা হয়। এ নিদারুণ করুণ অথচ সাংঘাতিক অপরাধমূলক কাজ।
Visit the Statistics of Female feticide in India.

পুত্রকন্যা জন্মানোর বিজ্ঞান-

মানুষের শরীরে 23 জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। সে পুরুষই হোক আর মহিলা। পুরুষ ও মহিলা ক্রোমোজোমের ধরন ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন প্রকৃতির। ক্রোমোজোম বংশগতির ধারাকে বজায় রাখতে সাহায্য করে।

অন্যদিকে বংশগতি বা সন্তান জন্মানো যৌন মিলনের ফলে সংঘটিত হয় একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে। এ ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার ক্রোমোজোমের মিলনে ফলাফলে জায়গোট সৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী করে করে।

পুরুষ ও মহিলা যৌন ক্রোমোজোম ভিন্ন প্রকৃতির। পুরুষের সেক্স ক্রোমোজোম XY নামে বন্ডিং অবস্থায় এবং মহিলার সেক্স ক্রোমোজোম XX নামে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ পুরুষের প্রতি জোড়া ক্রোমোজোমের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আছে। কিন্তু মহিলাদের একই প্রকৃতির সেক্স ক্রোমোজোম থাকে।

যৌন মিলনের সময় পুরুষের বীর্যে মত শুক্রাণু থাকে তার অর্ধেক X এবং বাকি অর্ধেক Y ক্রোমোজোম। কিন্তু মহিলাদের ডিম্বাণু সবই X ক্রোমোজোম। এবার যে শুক্রাণু X ক্রোমোজোম বিশিষ্ট তা ডিম্বাণু সঙ্গে মিলিত হলে XX জায়গোট অর্থাৎ স্ত্রী লিঙ্গ ধারণ করবে। কন্যা শিশু জন্মগ্রহণ করবে। আবার Y ক্রোমোজোম বিশিষ্ঠ শুক্রাণু ডিম্বাণু সঙ্গে মিলিত হলে XY অর্থাৎ পুংলিঙ্গ বা পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে।

আমাদের সমাজে মহিলাদের পুত্র বা কন্যা সন্তান জন্মানোর জন্য মা’কে দায়ী করা হয়। কিন্তু পুত্র বা কন্যা জন্মানোর জন্য পুরুষের ক্রোমোজোমই দায়ী। লক্ষ লক্ষ XY ক্রোমোজোমের মধ্যে শক্তিশালী শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মধ্যে মিলিত হয়ে জায়গোট তৈরী করে এবং আগামী সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণকে নিশ্চিত করে।

অর্থাৎ বলতে পারি মা, পুত্র বা কন্যা সন্তান সৃষ্টির জন্য দায়ী নয়। এ অবৈজ্ঞানিক অসামাজিক ধারণা থেকে সকলেই বেরিয়ে আসুন।

কন্যাভ্রূণ হত্যার ফলাফল-

কন্যাভ্রূণ হত্যার ফলাফল প্রসঙ্গে প্রসঙ্গে যা আসে তা হলো- কন্যা বা মহিলার সংখ্যা কমে যাওয়া। অন্যদিকে পুত্র বা পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। সমাজে, দেশে ও বৃহত্তর ক্ষেত্রে পৃথিবীতে পুরুষ ও মহিলার অনুপাত অসামঞ্জস্য বা ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়াই কন্যাভ্রূণ হত্যার প্রত্যক্ষ ফলাফল। এবার সেই ঘটনার প্রভাব গুলিকে নিম্নলিখিত ভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। যথা-

সামাজিক বিশৃঙ্খলা-

সমাজকে ক্ষুদ্রতর স্বার্থে সম্প্রদায়গত ভাবে বিভক্ত করলে বলা যেতে পারে- হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি

 আবার এই সম্পর্ক গুলোর মধ্যে উপ সম্প্রদায় আছে।

সমস্ত উপসম্প্রদায় বা সম্প্রদায় গুলির মধ্যে কন্যাভ্রূণ হত্যা কমবেশি সমানভাবে প্রচলিত‌। অর্থাৎ সেই সম্প্রদায়ের মধ্যে কন্যা সন্তান হ্রাস পাচ্ছে। এবং সার্বিকভাবে সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেও তা সমান ভাবে প্রভাবিত।

অন্যদিকে আদিবাসী সমাজে কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা একেবারে নেই বললেই চলে। কেননা এই সমাজ মাতৃতান্ত্রিক পদ্ধতিকে বেশি প্রাধান্য দেয়।

সমস্ত সম্প্রদায় নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে প্রধান্য ও প্রচলিত করে। নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে মহিলার সংখ্যা হ্রাস পাওয়া অর্থ সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করা। এর ফলস্বরূপ নিচের ঘটনাগুলি ঘটে।

বিবাহ বিশৃঙ্খলা-

এক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন করার প্রথা প্রচলিত থাকলে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান অবলুপ্তি হওয়া সম্ভাবনা। কেননা ওই সম্পদের মধ্যে মহিলা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বহুবিবাহ-

এক মহিলার বহুবিবাহের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আর এ ধরনের ঘটনা নারী সমাজকে সাংঘাতিক ভাবে নির্যাতন ও অপমান, অসম্মান মুলক আচরণের শিকার হতে হবে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, নারী পাচার-

নারীর সংখ্যা হ্রাস, অবিবাহিত পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা সাংঘাতিক অস্ত্র। অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রক্তচক্ষু ধর্ষণের মতো অনভিপ্রেত আচরণকে ত্বরান্বিত করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।

তাছাড়া শ্লীলতাহানি সম্ভাবনা তৈরি হবে। নারী পাচারের মতো সামাজিক অপরাধমূলক কাজকর্ম বৃদ্ধি পেতে থাকবে থাকবে।

এরই ফলাফলস্বরূপ অসবর্ণ বিবাহ নিয়ে ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন প্রান্তে প্রেমিক-প্রেমিকাকে পর্যুদস্ত করা, এমনকি হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে।

স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা-

সামাজিক অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা নারীর বহুগামিতা, ধর্ষণ ইত্যাদির মতো আচরণগুলো সমগ্র মানব সমাজকে মানসিক ও শারীরিকভাবে রোগগ্রস্ত করে তুলবে। সমস্ত সমাজ স্বাস্থ্যহানির সমস্যায় পড়তে থাকবে। নতুন নতুন রোগ সৃষ্টির সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা যায় না। 

সৃষ্টি ব্যাহত-

যেহেতু বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা আছে তাই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত যৌনমিলনও বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনাকে বৃদ্ধি করবে। ফলে জন্মগ্রহণও বিঘ্নিত হবে। একটা সমাজ বা দেশ বৃহত্তর ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীর আগামী প্রজন্মের আগমনের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু গোষ্ঠীসমাজ ও দেশের জনসংখ্যার অস্থিত্ব বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মানেকা গান্ধীর ভ্রুণহত্যা নিয়ে বিকল্প মতামত-

লিঙ্গ নির্ধারণ ও ভ্রুণ হত্যা নিয়ে দেশে আইন আছে কিন্তু পালন করার লোকও যেমন নেই, তেমনি আইন রক্ষা করার পদ্ধতি কার্যত মুশকিল হয়ে পড়ছে। জেল জরিমানার ভয় আছে ঠিকই, কিন্তু নিষিদ্ধ কর্মের প্রতি আকর্ষণ, সামাজিক সমস্যা, অর্থের প্রতি লোভ সমান্তরালে চলমান। এই কার্যপ্রণালীর বিপরীত পন্থা হিসেবে প্রাক্তন নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী মানেকা গান্ধী এক বিশেষ মতামত দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন লিঙ্গ নির্ধারণ নিষেধ আইনটাকে তুলে দিয়ে গর্ভধারণের সঙ্গে সঙ্গে লিঙ্গ নির্ধারণ বাধ্যতামূলক করা হোক। এর স্বপক্ষে তার যুক্তি- গর্ভধারণের সঙ্গে সঙ্গে লিঙ্গ নির্ধারণ হলে সরকার প্রথম থেকেই জানতে পারবে কোন মায়ের গর্ভে কি সন্তান রয়েছে। ফলে সরকারের পক্ষে মনিটর করতে সুবিধা হবে। অর্থাৎ গর্ভধারণ, লিঙ্গ নির্ধারণ এবং জন্ম গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা সরকারপক্ষে সুবিধা হবে। এরমধ্যে কোনো অসঙ্গতি থাকলে সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ গুলি সহজে নিতে পারবে। বিশেষ করে কন্যাভ্রূণ থাকলে তার প্রতি বিশেষ নজরদারি করা সম্ভব হবে।

শ্রীমতি গান্ধীর এই মতামতে অবশ্য রাজনৈতিক এবং সমাজকর্মীরাও দুই দলে বিভক্ত। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি আছে। এ নিয়ে বিতর্ক চলুক, তাতে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের নিমিত্তে কার্যসিদ্ধি বন্ধ হওয়া উচিত।

একদল বলেছিলেন লিঙ্গ নির্ধারণ নিষেধাজ্ঞা আইনটা সরকার ঠিকমত পরিচর্যা করতে পারছে না। এ সরকারেরই ব্যর্থতা। তাই তারা এই আইনটাকে তুলে দিয়ে বাধ্যতামূলক লিঙ্গ নির্ধারণ আইন জারি করতে চাইছে। এ আইন চালু হলে মা ও শিশু স্বার্থ বিরোধী আইন হবে।

তাছাড়া মায়ের গর্ভে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে সেই পরিবার প্রথম থেকে মায়ের প্রতি অবিচার করবে ও ঠিকমতো পরিচর্যা করতে চাইবে না।

অন্যদল বলছে লিঙ্গ নির্ধারণ নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে বাধ্যতামূলক লিঙ্গ নির্ধারণ আইন প্রয়োগ করা করে দেখা যেতে পারে। সমাজকর্মী অধ্যাপক শাশ্বতী ঘোষের বক্তব্য ছিল- আগে দেশের আলট্রাসাউন্ড মেশিন গুলি নথি সরকারের হাতে থাকা জরুরি। নথির বাইরে কোন সংস্থার কোন মেশিন লিঙ্গ নির্ধারণ করছে সেটাও নজরে আনা অত্যন্ত জরুরী।

Read More- পরিযায়ী শ্রমিক কিন্তু পরিযায়ী নেতা নয় কেন?
মহিলাদের প্রতি প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি।
ভারতের সামাজিক সমস্যা।

উপসংহার- 

সমাজের সুহৃদ ব্যক্তি সংখ্যাও কম নয়। সচেতন সু-বোধ যুক্ত মানুষের জন্য সামাজিক শৃঙ্খলা বর্তমানে এখনো আছে। তাই সামান্য হলেও সমাজ কন্যাসন্তান জন্ম ও তাকে অতি আদরে যত্নে মানুষ করার পিতা-মাতা, ঠাকুরদা-ঠাকুরমা সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সংখ্যাও কম নয়। কন্যাদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে সংখ্যা বৃদ্ধি সেটাই বলে। আমরা আশাবাদী। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আগামীদিনে পিতা-মাতার ভূমিকায় সুশীল সমাজের উপযুক্ত দায়িত্ব-কর্তব্যের সম্পূর্ণ সামাজিক মানুষ হিসেবে দেখব। তাদের কাছে পুত্র-কন্যার কোনো ভেদাভেদ নয় বরং একে একে অপরের পরিপূরক আচরণের দৃষ্টিভঙ্গিতে সকলকে দেখবে। কন্যাভ্রূণ হত্যা নয়। শিশু কন্যা হত্যাহীন উৎকর্ষ সমাজ তৈরি হবে। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *