আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস- Mother Language Day 2024

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস(Mother Language Day 2024): আচ্ছা বলুন তো, কোন বঙ্গাব্দের কত তারিখ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস? হয়তো গুগুল করতে শুরু করলেন। তার দরকার নেই। আমার এই নিবন্ধেই পেয়ে যাবেন। হ্যাঁ আমিও নেট সার্চ করলাম- বলতে লজ্জা নেই। তবে এখানেই থেমে যাবেন না। এই নিবন্ধে রয়েছে বাংলা ভাষার মান অপমান শ্রদ্ধা অশ্রদ্ধা বিষয়ে যুক্তিপূর্ণ সুন্দর মতামত।  

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস- Mother Language Day 2024

বাস্তব বিষয় হল আমাদের মত বাঙ্গালীদের, যে ভাষার জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আবির্ভাব সেই ভাষার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মাতৃভাষা দিবসের তারিখের খবর রাখিনা।

লজ্জা পাবার কোন ব্যাপার নেই। কেননা বাংলা ভাষার হাত ধরে যখন আন্তর্জাতিক স্তরে মাতৃভাষা দিবসে উন্নীত হয়, তখন সারা পৃথিবীর মানুষ যে ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে সেই ক্যালেন্ডারের দিনক্ষণকেই মেনে চলতে হবে।

তবে অনেকেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বাংলা ক্যালেন্ডারে তারিখ জানেন- তাদের নমস্কার, সেলাম, স্যালুট। আবার এটা ঠিক সকলকেই সব বিষয়ে একশ শতাংশ জানতেই হবে, এমন নয়। আবার ‘জানার কোন শেষ নেই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’ বলে ছেড়ে দিয়ে নিজের অকর্মতাকে গৌরবান্বিত করাটাও শুভ লক্ষণ নয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪ | Mother Language Day 2024-

আসুন আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪ এর লগ্নে মাতৃভাষা নিয়ে মান, অপমান, শ্রদ্ধা, অশ্রদ্ধার বিষয়গুলি নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত জানানোর চেষ্টা করি। তবে এটা কেবল ব্যক্তিগত মতামত বললেই শেষ হয়ে যায় না। একটা সার্বিক যুক্তি এবং তার গ্রহণযোগ্য তাও। নিবন্ধটি মন দিয়ে পড়ুন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এর ইতিহাস-

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস নিয়ে কিছু বলবো না‌। এই ইতিহাস বাঙালিরা জানেন না, হতে পারে না। তবে তবুও যারা জানেন না, জানতে ইচ্ছুক, তারা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে, পত্রপত্রিকা  বা কোন বই থেকে জেনে নিতে পারেন অনায়াসে। তবে আমি কেবল তিনটি ক্ষেত্র এবং তারিখ এখানে উল্লেখ করছি।

  • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইংরেজি তারিখ ২১শে ফেব্রুয়ারি- ১৯৫৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি হল ঐতিহাসিক নৃশংসতার দিন। অন্যদিকে আনন্দেরও। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’(পুরো রফিক, জব্বার, শফিউল, সালাম, বরকত সহ অসংখ্য বীর ভাষাযোদ্ধাদের আত্ম বলিদান নৃশংস বেদনার দিনটি ভাষা শহীদ দিবসের স্বীকৃতি। অন্যদিকে বাংলা ভাষার হাত ধরেই ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা- ব্যাখ্যাহীন শিহরণ অনুভূতি গায়ৈ কাটা দেয়, চোখ জলে ভরে আসে।
  • বাংলা ক্যালেন্ডারের দিনটি ছিল ৮ই ফাল্গুন বৃহস্পতিবার সন ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ।
  • ১৭ই নভেম্বর ১৯৯৯- এই দিনেই ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা তথা বাঙালিকে বিশেষ পরিচিতি দেয়। তবে এই পরিচিতি আদায়ের পেছনে ইতিহাসটাও রোমাঞ্চকর, শিহরণ ও অবরুদ্ধ রোদন আনে। এ ব্যাপারে রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালামের অবদান মনে রাখব চিরকাল। উইকিপিডিয়া থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির ইতিহাসটাও জেনে আসতে পারেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪-এ বাংলা ভাষা ও তার অবস্থা-

আমরা কি শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলি? এক কথায়- না। আমার এই লেখাটির মধ্যে স্বভাববসত, অজান্তে কোথাও কোথাও জগাখিঁচুড়ি হয়ে যাচ্ছে। ‘জগাখিচুড়ি’ শব্দটাই বা কী ধরনের শব্দ? এর কারণ অনুসন্ধানে বাংলা ভাষার উৎপত্তি, শ্রেণীকরণ, আঞ্চলিক বিন্যাস, শব্দভাণ্ডার, বর্তমানে ভাষা আদান-প্রদানের উন্মুক্ত ক্ষেত্র ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুই জড়িয়ে আছে। তবে এসমস্ত নিয়ে আজ আলোচনা করব না। এই সমস্যা কেবল যে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে ঘটছে তা নয়, সমস্ত ধরনের ভাষার মধ্যেই এই মিশ্রণ ধারাবাহিকভাবেই ঘটে চলেছে।

‘আত্মঘাতী বাঙালি’-

  • বাংলা ভাষা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুমিষ্ট ভাষা। গুগুলে সার্চ করলে দেখতে পাবেন- The sweetest language in the world.  সর্বশ্রেষ্ঠ সুমিষ্ট ভাষা বাংলা কিন্তু মিষ্টি কেনার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, তা অর্জন করার জন্য না’কি বাংলা ভাষায় কথা কথা বললে পাওয়া যাবে না। আর আঞ্চলিক গ্রামের বাংলা ভাষায় কথা বলাতো মহাপাপ বলে তথাকথিত আধুনিক সম্প্রদায় মনে করেন। তাহলে তারা কি খুবই অন্যায় করেন? তারা কি পাপিষ্ঠ? এর উত্তর আছে।
  • আমাদের নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ও অমর্ত্য সেন আছেন, অস্কার জয়ী সত্যজিত রায় আছেন, নজরুল আছেন, শরৎচন্দ্র আছেন, সুকান্ত, জীবনান্দ সহ আরো কত হুনি মানুষ আছেন। তবুও বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণে অনীহা।
  • প্রথমে আসি গ্রাম ও শহরে ছড়িয়ে পড়া বাঙালির কী ভাবছেন বাংলা ভাষা নিয়ে? বলতে চাইছি আঞ্চলিকতা নিয়ে। তার আগে একটি তথ্য দিই পৃথিবীতে কত মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন? ২০১১ থেকে ২০২১ এর একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে ২৩৪ মিলিয়ন, না বাংলায় বলি ২৩.৪ কোটি মানুষূর প্রধান ভাষা হল বাংলা এবং ৩.৯ কোটি মানুষের দ্বিতীয় ভাষা হল বাংলা। অর্থাৎ মোট ২৭.৩ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় সর্বাধিক। এর মধ্যে আছে বইয়ের লিখিত ভাষা এবং কথ্য ভাষা।
  • কথ্য ভাষার মধ্যে আঞ্চলিকতা ও তার জেরে উচ্চারণ। সেখান থেকে গ্রাম শহরের পৃথকীকরণ। এমন কি গ্রাম-গ্রাম, শহর-শহরের পার্থক্যটার মধ্যে রয়েছে ভালো খারাপের তকমা। আমরা ‘আঞ্চলিকতার দোষে দুষ্ট’ বলে একটি কথা ব্যবহার করি। ‘দোষে দুষ্টু’ কথাটা কি সম্মানজনক বা শ্রদ্ধার? কত তথাকথিত শিক্ষিত, ভদ্র মানুষজন, তিনি গ্রামের হোন বা শহরের, কোন মানুষ গ্রামের ভাষায় কথা বললেই কতই না তাচ্ছিল্য করেন। তাকে ধিক্কার।
  • অনেকেই গ্রাম থেকে ছোটবেলাতেই ছেলেকে সরিয়ে নিয়ে চলে যান শহরে। পড়াশোনা করাতে। ভালো কথা। কিন্তু ছেলেকে বা মেয়েকে ঠাকুরমা বা ঠাকুরদার ভাষায় কথা বললে তেড়ে আসেন। বকাঝকা করেন। কেন? কারন গ্রামীণ ঠাকুমা ঠাকুরদা গেঁয়ো ভাষায় কথা বলেন। বাবা-মায়ের কানের তার ছেলের মুখে গাঁয়ের ভাষা শুনতে অশ্লীল লাগে। বড় আনস্মার্ট মনে হয়।
  • কোনো কোনো মা’কে বলতে শোনা যায়- ‘বাবা ওয়াটারটা খেয়ে নাও।’ জলের বদলে বাংলা বাক্যে ‘ওয়াটার’ শব্দটা এক ঝটকায় হয়তো ধাক্কা মারে। কিন্তু এটাই ভবিতব্য। আমরা অনেক বাংলা বাক্যে স্বভাবসুলভ অভ্যাসে হিন্দি অথবা ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষার প্রয়োগ করে থাকি। এভাবে কি বাংলা শব্দ ভান্ডারে বিদেশী শব্দের আগমন হয়? শোনা যায় যত বিদেশি ভাষা শব্দ একটি ভাষায় প্রবেশ করে, সেই ভাষা না’কি তত সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু সেই ভাষার মৌলিকত্ব হিসেবে তার রূপটি খর্ব হয় কি’না প্রশ্ন রইল।

শহরে আত্মঘাতী বাংলাভাষী-

শহরের মানুষও কি আজকাল বাংলা ভাষায় কথা বলা পছন্দ করেন? এর উত্তর এক কথায় হ্যাঁ বা না দেওয়া যাবে না। মিশ্র লক্ষণ রয়েছে। এই লক্ষণটি অনেকটাই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেমন সামাজিক পরিস্থিতি, জীবন যাপনকে প্রভাবিত করে, তেমনি বাংলা ভাষা কার কাছে কেমন গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাও নির্ভর করছে আর্থিক পরিকাঠামোর উপর।।

বিশেষত ছেলে মেয়ের শিক্ষার মাধ্যম কী হবে, তা  নির্ভর করে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উপর। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ছেলেমেয়েদের স্বাবলম্বনের সহায়তায় বিশ্ব অর্থনীতির আগমনের পথকে সুগম করতে কোন ভাষা মাধ্যম সহজ ও সুদূরপ্রসারী ফল দেবে, তাকে গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে। সেক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্রাত্য হওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা ভাষা না জানা বা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করাটা গরিমার মধ্যে পড়ে।

কেন এমন অবস্থা হচ্ছে তার কারণ হিসেবে বিশ্বায়ন ও বিশ্ব উদার অর্থনীতির ধারাবাহিক কার্যক্রম ও উন্নত দেশগুলির অন্যান্য দেশগুলির উপর প্রভাব অন্যতম ঘাতক হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করছে। যদিও আঞ্চলিক স্তরে শিক্ষা ক্ষেত্রে মাতৃভাষার ব্যবহার ও অগ্রাধিকার সমস্ত শিক্ষা কমিশনে বিশেষভাবে পেয়ে এসেছে। এমনকি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০– তেও তার গুরুত্ব রয়েছে।

উন্নত দেশ বলতে মূলত ইউএসএ, কানাডা, ইউকে এর সারা বিশ্বব্যাপী গর্জনকে অবজ্ঞা করা যাবে না। এই দেশগুলির ভাষা ইংরেজি এবং সারা বিশ্ব এখন সবচেয়ে বেশি লোক ইংরেজিতে কথা বলেন। সুতরাং তার শাসন থাকবে না হতেই পারে না। পাশ্চাত্য চাকচিক্য, ধবধবে গায়ের রং, তকতকে জামা কাপড়, ভোগ বিলাসকে পেতে হলে বাংলা ভাষায় কথা বললে, বাংলা ভাষায় শিক্ষা নিলে কোনদিনই পূরণ হবার নয়। এ ভ্রম থেকে মুক্তির উপায় কী?

নিচে কয়েকটি ভাষার সারা পৃথিবীর কত মানুষ কথা বলেন দেখানো হলো এবং তার সম্পর্ক স্থাপক সূত্রটিও রয়েছে। ক্লিক করে দেখতে পারেন।

মাতৃভাষা দিবস- Mother Language Day 2024
Source- Wkipedia

তাহলে যারা বাংলা ভাষায় পড়াশোনা করছেন বা বাংলা ভাষায় কথা বলছেন না, তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করব? মোটেই নয়। বলা যেতে পারে তারা কারও শিকারে পরিণত হয়েছেন এবং শিকারী কে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পূর্বে কিছু আভাস দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য ভাষা শেখার আগ্রহকে কেউ অবদমন করবেন, সে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হওয়াটাও বাঞ্ছনীয়।

  • তবে কি বাংলা ভাষা শেষ হয়ে যাচ্ছে?

চন্দ্রিল ভট্টাচার্য নিঃসন্দেহে সমসাময়িক সুবক্তা, বুদ্ধিজীবী মানুষ। তার নামের পূর্বে বিশেষ্য, বিশেষণ গুলো তিনি পছন্দ করবেন কি’না জানিনা। তবে তাকে আমার বেশ ভালো লাগে। তার বক্তব্য শুনি। আনন্দবাজারে দু-একটা লেখা ছাড়া তার বিশেষ কিছু লেখা পড়া হয়নি। তিনি একটি ভিডিওতে বলছেন- বাংলা ভাষা সংস্কৃতি মরে যাচ্ছে ও যাবে। কারণ বাংলা ভাষায় টিভিতে কেউ বলে না, উচ্চ সম্ভ্রান্ত, বুদ্ধিজীবী মানুষেরা বলেন না।

যতই সভা, সমিতি, সিনেমা, টিভিতে বসা মানুষজন বাংলা ভাষায় কথা বলবেন, তবেই বাংলা ভাষা তার স্থানটি ধরে রাখতে পারবে। তবেই বাঙালি জাতি বাংলা ভাষায় কথা বলবে। অর্থাৎ ওদের অনুসরণ করবে। একটি বিতর্কে রূপম ইসলাম, শ্রীজাত সহ অনেকেই অংশগ্রহণ করেছেন। বির্তকের বিষয়- বাংলা ভাষার পিঠ দেওয়ালে থেকে গেছে

এ তার আক্ষেপ। যদি বাংলা ভাষাকে বাঁচানোর এটাই শর্ত হয়, যদি তার আক্ষেপ না হয়, তাহলে একটি প্রশ্ন- সংস্কৃত ভাষার মৃত্যু হল কেন? আমার যতদূর জানা নিপীড়িত, দরিদ্র, বঞ্চিত, অবহেলিত, অসচ্ছল শ্রেণীকে সংস্কৃত ভাষায় কথা বলতে দেওয়া হতো না। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়শ্রেণীর মধ্যে সংস্কৃত ভাষা সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ এটা একটি কুলীন ভাষা হিসেবে মানা হতো। তাই প্রসার লাভ করেনি। আজ কোন সমাজে কথ্য ভাষা হিসেবে সংস্কৃত ব্যবহার হয় না। কেবল পাঠক্রমে আছে। তবুও পশ্চিমবাংলায় উচ্চ মাধ্যমিক থেকে ডিগ্রী কোর্সের, সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়া হয় বাংলা ভাষাতে। অবাক লাগে।

  • সিনেমার সিরিয়ালের আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ-

শহরে সিনেমা সিরিয়াল সংস্কৃতিতে আঞ্চলিক বাংলা ভাষাকে এমন ভাবে ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে মজাদার কৌতুক পরিবেশনটাই মুখ্য মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। আর কিছু থাকে না। সেখানকার পরিবেশনে আঞ্চলিক বাংলা ভাষার ভুল উচ্চারণ ও বিশেষ কিছু শব্দের উৎকট অবস্থান আঞ্চলিক ভাষাটিকে মর্যাদা তো দেয়ই না বরং অবমাননা বলেই প্রতিপন্ন হয়। এ ত্রুটি পরিচালক ও কলাকৌশলীদের অপদার্থতা ছাড়া কিছু নয়।

তবে খরাজ মুখার্জির মত স্বনামধন্য শিল্পী বীরভূমের আঞ্চলিক ভাষার প্রকৃত উচ্চারণের প্রকাশ অনবদ। বাঁকুড়া পুরুলিয়া মুর্শিদাবাদ জেলার সহ অন্যান্য জেলার কিছু ভূমিপুত্র শিল্পী রয়েছেন, যারা তাদের এলাকার আঞ্চলিক ভাষাকে গর্বের সঙ্গে শৈল্পিকভাবে প্রচার করে চলেছেন। তাদেরকেও বাহবা দিতে হয়। বাংলাদেশের কলাকৌশলীদের সেখানকার বিভিন্ন প্রান্তের আঞ্চলিক ভাষার উচ্চারণকে ‘তারিফ’ না করে পারিনা।

বর্তমানে সংস্কৃত ভাষায় কত মানুষ কথা বলেন?

পরিসংখ্যান অনুযায়ী যেটা বেরিয়ে আসে, তা হল-

২০০১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী ১৪,১৩৫জন সংস্কৃত ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসবে ব্যবহার করেন বলে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে ১২,৩৪,৯৩১জন এবং তৃতীয় ভাষা হিসাবে ৩৭,৪২,২২৩ জন মানুষ সংস্কৃত ভাষাকে ব্যবহার করেন।

বাংলা ভাষা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা এখনো দুর অস্ত। যত সংখ্যক পৃথিবী বাসী বাংলা ভাষায় কথা বলেন তাকে গ্রাস করা এত সহজ হবে না। তবে আন্তর্জাতিক স্তরে ইংরেজি বা ভারতের ক্ষেত্রে জাতীয় স্তরে হিন্দি ভাষা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় বাংলা ভাষার উপর প্রভাব ফেলছে না, সে কথাও নিশ্চিত বলা যায় না। তবে বাংলাদেশের বাংলা ভাষা ধরে রাখছে এবং আগামীতে ধরে রাখবে।

বাংলা ভাষার রক্ষী-

বাংলা ভাষাকে রক্ষা করবে কে? সামাজিক মাধ্যমের দৌলতে দেখা যাচ্ছে কিছু ভাষা বাঁচাও কমিটি অস্তিত্ব। তাদের কিছু কিছু কার্যকলাপ চোখে পড়ার মতো। আবার কিছু কমিটি ‘রক্ষাকর্তাগিরি’র ভূমিকাকে অসহ্য এবং অসভ্য লাগে। পশ্চিমবাংলায় অন্য ভাষাভাষী মানুষদের উপর জোর করে বাংলা বলানোকে কেন্দ্র করে হেনস্থা করা মোটেই শোভনীয় দেখায় না। রেস্টুরেন্টে, হোটেলে, ট্রেন কর্মীদের অথবা অন্যান্য স্থানের বাঙালি মানুষদের তাদের উপর লাঞ্ছনার ভিডিওগুলি দেখে মর্মাহত হই। এটা কি বাংলা ভাষা বাঁচানোর একটি পন্থা?

প্রশ্ন আসে ভারতের অন্য প্রান্তেও বাঙ্গালীদের উপর তো এমন লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। তখনও অন্য ভাষাভাষী মানুষদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, লাঞ্ছনা কারীদের ধিক্কার। এ বড় পীড়ন, বড় শ্লাঘা, বড় লজ্জার কথা। ‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’- এর ভারতবর্ষে কেউ কারুর উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেবে না। এরা প্রত্যেকেই স্ব-মতে, স্ব-ভাষায়, স্ব-মহিমায় যাপনে বিরাজমান হবার মিলনমন্ত্র ভুলে গিয়ে আঞ্চলিকতার কলুষিত রূপটাই প্রকট করছে।

শোনা যায় হিন্দি ভাষা অনেক ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করেছে। বাংলা ভাষাকেও করতে চলেছে। তাকে বাঁচানোর পন্থা হিসেবে পশ্চিম বাংলায় অন্য ভাষাভাষীর মানুষকে জোর করে বাংলা বলাবো, তাকে শেখার সময়, সুযোগ, ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দিয়ে? এভাবে বাংলা ভাষা বাঁচতে পারেনা। দেখতে হবে বাঙালিরা বাংলা ভাষা থেকে বিমুখ হচ্ছে কেন? অন্য কোন কোন ভাষার প্রতি তারা আকর্ষিত হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে? এর কারণ হিসেবে পুঁজিবাদের আগ্রাসনকে দায়ী করা যায়। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে যেমন হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার আকর্ষণ, এমনি ভারতের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার প্রতি কৌলিন্যতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

অন্য ভাষার প্রতি সম্মান-

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪ এ অঙ্গীকার হোক সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান। প্রত্যেক ভাষাপাষির মানুষ তার নিজস্ব ভাষাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসেন। মাতৃভাষায় কথা বললে তাকে সেখান থেকে বিচ্যুত করার অধিকার কারোর নেই। পরিচ্যূত করা বা নিজের প্রভাবকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়াটা বড় অন্যায়। আমার উপর অন্যের ইচ্ছার চাপানোর ক্ষেত্রে যেমন সেটি অপরাধ, তেমনি আমিও অন্যকে বাধ্য করবো না আমার ভাষায় তাকে কথা বলানোতে। তাহলে দুজন ভিন্নবাসী মানুষ কথা বলবেন কিভাবে?

অন্য রাজ্য বাংলা ভাষাকে সম্মান দেয়-

বাংলা ভাষা নিয়ে যারা সংশয় প্রকাশ করছেন যে বাংলা ভাষাকে কেউ মর্যাদা দেয় না,  এ ধারণা তাদের হীনমন্যতার পরিচয়। এর থেকে দূর দূরে সরে আসার জন্য বলি- ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষত্ব তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ইত্যাদির হাসপাতালে নির্দেশনা সংক্রান্ত বোর্ড গুলিতে ইংরেজি, হিন্দি, সেখানকার আঞ্চলিক ভাষার সাথে সাথে বাংলা ভাষায় লেখা লক্ষ্য করা যায়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪{Mother Language Day 2024} এর অঙ্গীকার-
মাতৃভাষা দিবস- Mother Language Day 2024
  • নিজের মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধার সম্মান জানানো এবং মননে ধারণ,
  • অন্যের মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা সম্মান জ্ঞাপন,
  • অন্য ভাষা শেখার ইচ্ছাকেও সমর্থন,
  • পুঁজিবাদী ভাষার কাছে দ্রব্যে পরিণত না হওয়া,
  • ভাষা হোক মিলনের সেতু, বিচ্ছিন্নতা নয়

উপসংহার-

এরমধ্যে অনেক কিছুই বলা হলো না। কিছু আমার দিক থেকে আর কিছু আপনাদের কাছ থেকে। চেয়ে রইলাম মন্তব্য বাক্সের দিকে আপনাদের মতামতের আশায়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪-এ শুভ হোক আপনার জীবন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

Leave a Comment